সুনামগঞ্জ , শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ফ্যামিলি কার্ডে টাকা দাবি বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মাঠে তথ্য সংগ্রহকারী কর্মী স্ত্রী আটকের পর অসুস্থ ছাত্রলীগ নেতা, পরিবারের দাবি নির্যাতন, পুলিশের অস্বীকার ঐতিহাসিক বাঁশতলায় নান্দনিক স্থাপনার নামকরণ নিয়ে ক্ষোভ পরীক্ষা হলে পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করবে এআই শাল্লার কৃতী সংগীতশিল্পী রাখাল চক্রবর্তীর প্রয়াণ, লোকসংগীতে রেখে গেলেন অনন্য অবদান বাড়িতে পুরুষশূন্যতার সুযোগে ৬ গরুসহ ৫০ লাখ টাকার মালামাল লুট ইউপি নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিল, সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড মাহবুবউল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড, আওয়ামী লীগের আরও ৩ নেতার যাবজ্জীবন ভাটির জনপদে ‘ভাইয়াফি কুস্তি’ সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বিবৃতি ফাটল-ভাঙনে বেহাল ধর্মপাশার কালীজানা সেতু, পারাপারে জীবনের ঝুঁকি নাব্যতা সংকটে রঙ্গারচরা-পাটলাই নদী খননের দাবিতে মানববন্ধন অনিয়ম ঢাকতেই এমপি নূরুলের বিরুদ্ধে ঠিকাদারের অভিযোগ তলবের পরও যাননি প্রকল্প এলাকায়, ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকাবাসী চুমু বা আদরের আড়ালে শৈশবের অস্বস্তি ও ট্রমার গল্প জামালগঞ্জে যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন প্রত্যয় স্কুলে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উদযাপন জগন্নাথপুরে সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ২, গ্রেফতার ৪ জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ ‎জামালগঞ্জে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, গ্যাসের অতিরিক্ত দাম নেওয়ায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
অভিযোগে তোলপাড়

ফ্যামিলি কার্ডে টাকা দাবি বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মাঠে তথ্য সংগ্রহকারী কর্মী স্ত্রী

  • আপলোড সময় : ৩১-১০-২০২৬ ০৪:৪২:৪৫ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ৩১-১০-২০২৬ ০৪:৪৪:১৮ অপরাহ্ন
ফ্যামিলি কার্ডে টাকা দাবি বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মাঠে তথ্য সংগ্রহকারী কর্মী স্ত্রী
স্টাফ রিপোর্টার::
দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। কিন্তু সেই কার্ড পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে সুনামগঞ্জের শাল্লায় পরিবারপ্রতি ৩ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে তথ্য সংগ্রহকারী বর্ণা রানী সরকার ও তাঁর স্বামী হবিবপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড চাকুয়া গ্রামের বিএনপির সভাপতি বিদ্যুৎ সরকারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, টাকা দিতে রাজি না হলে দরিদ্র পরিবারের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে না। এ অভিযোগের সমর্থনে বিদ্যুৎ সরকারের টাকা দাবির কথোপকথনের একটি ভিডিও এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। অন্যদিকে, চূড়ান্ত ও অপেক্ষমাণ কোনো তালিকাতেই নাম না থাকার পরও বর্ণা রানী সরকার কীভাবে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
অভিযোগের পর বর্ণা রানী সরকারের তথ্য সংগ্রহের আইডি নিষ্ক্রিয় করেছে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়। তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে এবং এর অনুলিপি জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা। তবে তালিকার বাইরে তাঁকে কে বা কারা দায়িত্ব দিয়েছেন, কোন প্রক্রিয়ায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট হয়নি।

জানা যায়, শাল্লা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে মাঠপর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য ৩৪ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। পাশাপাশি আরও ১৬ জনকে অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয়। হবিবপুর ইউনিয়নে চূড়ান্ত তালিকায় ছিলেন আটজন। চাকুয়া গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পাওয়ার কথা ছিল জুয়েল চন্দ্র দাসের।
কিন্তু সরেজমিনে ওই ওয়ার্ডে তথ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায় বর্ণা রানী সরকারকে। এ বিষয়ে জুয়েল চন্দ্র দাস জানান, চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, চূড়ান্ত ও অপেক্ষমাণ কোনো তালিকাতেই বর্ণা রানী সরকারের নাম পাওয়া যায়নি।
এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নির্ধারিত তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও বর্ণা রানী সরকার কীভাবে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেলেন? তাঁকে কে সুপারিশ করেছেন, কোন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছে এবং চূড়ান্ত তালিকায় থাকা জুয়েল চন্দ্র দাসকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি? দায়িত্ব বণ্টনের নথি ও অনুমোদন প্রকাশ না হওয়ায় এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্ত করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য পরিবারপ্রতি ৩ হাজার টাকা দাবির অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদকের হাতে থাকা ভিডিওতে বিদ্যুৎ সরকারকে একজন উপকারভোগীর উদ্দেশে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ৩ হাজার টাকা দিতে হবে বলে বলতে শোনা যায়। এ সময় ওই উপকারভোগী কিছু টাকা কম নেওয়ার অনুরোধ করেন। 
চাকুয়া গ্রামের কয়েকজন উপকারভোগীর অভিযোগ, বর্ণা রানী সরকার মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করলেও পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁর স্বামী বিদ্যুৎ সরকার। তাঁদের দাবি, কোনো পরিবার টাকা দিতে সম্মত হলে সেই পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আর টাকা দিতে রাজি না হলে তথ্য নেওয়া হয় না। এতে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারগুলো সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী উপকারভোগী বলেন, বিদ্যুৎ সরকার আমাকে বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড পেতে হলে ৩ হাজার টাকা লাগবে। শুধু আমাকে নয়, আশপাশের সব মহিলার কাছেই টাকার কথা বলেছেন। আমি গরিব মানুষ, পরের বাড়িতে কাজ করে খাই। তাঁকে ২ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি রাজি হননি। আমাদের তথ্যও নিচ্ছেন না।
টাকা দাবির অভিযোগ এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সরকার এই প্রতিবেদককে বলেন, আপনি শিক্ষিত হলে বুঝবেন "স্লিপ অব ট্যাং অফ মাউথ হয়ে গেছে" এর জন্য আমি সরি। আর কখনো এমন হবে না। তারা কখনো কিছু পায় নাই বলছে, তাই আমি তাদের উপকারের জন্য বলছি। আমি এই ওয়ার্ডের বিএনপির সভাপতি, আমাকে শাল্লা উপজেলা সহ এমপি সাহেব আমাকে চিনে।
তিনি আরও বলেন, আমরা যেহেতু পার্টি করি, তাই আমার স্ত্রীর চাকরিটা হয়েছে। আওয়ামী লীগ থাকলে তো হতো না।
বিদ্যুৎ সরকারের এই বক্তব্য তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব বণ্টনে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব ছিল কি না, সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিটি ও প্রশাসনের কাছে দায়িত্ব বণ্টনের লিখিত নথি প্রকাশের দাবি উঠেছে। 
অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহকারী বর্ণা রানী সরকারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন ওয়ার্ডে তথ্য সংগ্রহ করছেন, সেই ওয়ার্ডের নামও বলতে পারেননি। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরপরই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
একজন দলীয় নেতার বিরুদ্ধে সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির নামে টাকা দাবির অভিযোগ ওঠায় বিএনপির ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আওয়াল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড। যদি কোনো ব্যক্তি বা দলের লোক এই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে বিদ্যুৎ সরকারের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কোনো তদন্ত বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা দলীয় তদন্তে প্রমাণিত হলে তাঁকে ওয়ার্ড সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি বা দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শাল্লা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বিশ্বপতি চক্রবর্তী বলেন, বিষয়টি আমরা জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর আইডি ডিঅ্যাক্টিভ করেছি। বর্ণা রানী সরকার আর কোনো তথ্য নিতে পারবেন না। উপজেলায় এ বিষয়ে মিটিং করে বর্ণা রানী সরকারকে শোকজ করেছি। শোকজের অনুলিপি জেলায় পাঠিয়েছি।
অন্যদিকে, শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন কমিটির সভাপতি প্রিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে বসে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
ফ্যামিলি কার্ড দরিদ্র পরিবারের জন্য সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ। এ কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে টাকা দাবির অভিযোগ এবং দায়িত্ব বণ্টনে অনিয়মের প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, তথ্য সংগ্রহের পর্যায়েই যদি অর্থ লেনদেন বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা কতটা নির্ভুল ও নিরপেক্ষ থাকবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কোনো ব্যক্তি বা দলের ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হতে পারে না। দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য সুবিধা পেতে যদি অর্থ দিতে হয় এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তা শুধু অনিয়ম নয়, অসহায় মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করার গুরুতর ঘটনা। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়িত্ব বণ্টনের স্বচ্ছতা, দলীয় জবাবদিহি এবং বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন এলাকাবাসীর প্রধান দাবি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
ফ্যামিলি কার্ডে টাকা দাবি বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মাঠে তথ্য সংগ্রহকারী কর্মী স্ত্রী

ফ্যামিলি কার্ডে টাকা দাবি বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মাঠে তথ্য সংগ্রহকারী কর্মী স্ত্রী